Tue. Sep 24th, 2019

রঙিন অক্ষর সম্পর্ক

অনুব্রতা গুপ্ত

1 min read
Spread the writing

কথপোকথন

-আচ্ছা, একটা হীরের মূল্য কার কাছে সবচেয়ে বেশি?ক্রেতা?বিক্রেতা না দর্শক?

-সেই মানুষটির কাছে,যে প্রতিদিন হীরের দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ভাবে এমন একটা হীরের আংটি তার প্রেয়সীর হাতে পরিয়ে দেবে।কিন্তু পারে না কোনেদিন।

-তার মানে যে কামনা করছে কিন্তু এফোর্ড করতে পারছে না?

-হুম।ঐ ইচ্ছের কাছে সবচে’ মূল্যবান।

-বা ব্যর্থতার কাছে?তারমানে এই যে তুমি আমাকে পেয়েছো এতে আমার মূল্য কমে গেছে?

-অবশ্যই।প্রতিদিন কমছে।কমতেই থাকবে।

-তাহলে যে পায়নি তার কাছে এই মুহুর্তে আমার মূল্য সবচেয়ে বেশি?

-আমার হিসেব তো তাই বলে।

-আর কার কাছে হীরের মূল্য সবচেয়ে কম?

-যারা খনিতে উদ্ধারকার্য চালায়।

-কেন?

-তাদের হীরের প্রতি লোভ নেই।করুণা থাকতে পারে!

-আশ্চর্য না?

-হুম।মানুষ ক্ষয়ে যাচ্ছে জেনেও থেকে যেতে চায়।

-তবে ভালোবাসা বলে কিছু নেই?

-আছে।তবে তা একটা মানুষ নয়।একটা শরীরও নয়।ভালোবাসাই অন্তিম।আবার ভালোবাসাই অনন্ত।
ভালোবাসা আনন্দ।যে আনন্দ চোখে দেখা যায় না।যে আনন্দের খোঁজ পেলে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।ডুবে যেতে চায়।যে অপার সৌন্দর্য কাউকে দেওয়া যায় না।

-খুব উঁচু পাহাড় থেকে যেভাবে আত্মাহুতি দিতে ইচ্ছে হয়? সেই আনন্দ?

-হ্যাঁ।যে মৃত্যুর জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।

-তবে মৃত্যু কি?

-অপূর্ব বিষাদ।

-যেখানে জীবন আর মৃত্যু একই সরল রেখায় দাঁড়ায় সেখানেই আমরা পৌঁছতে চাইছি?

-হ্যাঁ।

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

কবি পরিচিতি

নবজাতক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত কবি অনুব্রতা গুপ্তের কাব্যগ্রন্থ

কবি অনুব্রতা গুপ্তের জন্ম কলকাতায়।বর্তমানে সিঙ্গাপুর নিবাসী।কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতক ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ।গতবছর কলকাতা বইমেলায় প্রথম একক কাব্যগ্রন্থ “চাঁদ ও চুমুর ভগ্নাংশ ” প্রকাশিত হয়।আগামী বইমেলাতে ও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

সংবেদনশীল আলস্যের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকে স্কুলের বান্ধবী।হুবুহু একইরকম দেখতে।বহুবছর কথা নেই।যেকোনো বিচ্ছেদ আমাকে আজকাল ক্লান্তিহীন করে তোলে।শুধু ঘুমের ভেতর জেগে ওঠে আমার বয়ঃসন্ধির চাঞ্চল্য।জ্যামিতিক নক্সাগুলো আমার করুণ অংকের ক্লাস মনে করিয়ে দেয়। বাস থেকে নামার পর একটা সোজা রাস্তা ধরে বাড়ি যেতে হতো।মা মাঝেমাঝে অপেক্ষা করতেন আমার বাড়ি ফেরার।কোমরের বেল্টটা আলগা করার আগেই সারাদিনের সঞ্চিত সমস্ত সরল সুখপাঠ্য কলকল করে বলতাম।
মা সবকিছু শোনার ভান করে দুগরস ভাত বেশি মুখে পুরে দিতেন।তখন আমি বাংলা সিরিয়াল দেখেও কাঁদতাম।যেমন মা এখনো কাঁদে।

যে বাংলার দিদিভাইয়ের থেকে আমার সিরিয়াসলি বাংলা শেখা (যতটুকু পারি)।তিনি একটা কালো চৌকো ফ্রেমের চশমা পরতেন।সমস্ত কবিতা লিখতে দিতেন দাঁড়ি কমা সমেত।একটা প্রশ্নের উত্তরও কোনোদিন লিখিয়ে দিতেন না।বলতেন “নিজে লেখো।তবেই তো শিখবে”। এবং আমার বহুদিন ধারণা ছিলো সম্ভবত সেই কারণেই মাধ্যমিকে ৭০% পেয়েছিলাম।লেটার পাওয়া হয়নি।লজ্জায় না রাগে রেজাল্ট দেখাতে যাইনি।বাবাকে পাঠিয়েছিলাম।বহুবছর পর কলেজের তখন সেকেন্ড ইয়ার,এক বন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরছি।সরু অন্ধকার ছোটো একটা গলি দিয়ে, দেখি সামনে দিদিভাই।কী মনে হলো জানিনা,প্রণাম করলাম।সেদিন ছিলো টিচার্স ডে।কী অদ্ভুত!মাঝে পেরিয়ে গেছে চারবছর।চারটে বছর একটা মানুষের থেকে অহেতুক অভিমানে মুখ ফিরিয়ে ছিলাম আমি?
দিদিভাই হেঁটে যাচ্ছেন।আমি দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ।
অদ্ভুত একটা ওলটপালট আনন্দ হচ্ছে বুকের মধ্যে।
আমি কি সেদিন নিঃশব্দে ক্ষমা চেয়েছিলাম?
উনি কি নিঃশব্দে ক্ষমা করেছিলেন?

তারপর আর কথা হয়নি।একদিন পুজোর সময় দেখলাম নীচের দোকান ঘরে দিভাইয়ের ছবিতে মালা পরানো।আমি ভেতরে যাইনি।আমি এখনো বিশ্বাস করি একটা অন্ধকার রাস্তা ততোটা অন্ধকার নয়!

বান্ধবীরা যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।কথা নেই।
আমি বহুজনের ঈর্ষার তালিকাভুক্ত।যদি ও আমি জানি দু তিনটে শব্দ বপন ছাড়া আমার নিজের আর কিছু নেই।তারা হয়তো বেশিকিছু ভাবে।

এসব কথা নিতান্তই কথার কথা।
এমনিতে আমার মন খারাপ হয় না।
যেভাবে পাখিরা জানে তাদের কোনো নির্দিষ্ট গাছ নেই।

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে ঘোষণা

মাঝারি উচ্চতা। চাপা গায়ের রঙ।চুল কোমর অবধি বিছানো।
নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে তার পরনে ছিলো কালো রঙের জামা আর প্যান্টের রঙ মনে করে কেউ বলতে পারেনি।
মেয়েটিকে শেষ দেখা গিয়েছিলো দোতলার বারান্দায়।
দুপুরে খেয়েছিলো রুই মাছের পাতলা ধনেপাতা বড়ির ঝোল।

এরপরেই মেয়েটি সম্ভবত নিরুদ্দেশ।

মেয়েটির মা বলেছেন “কোথাও গেলে আমাকে তো অন্তত বলে যায় “।

মেয়েটির বাবাকে এখনো খবর দেওয়া হয়নি।

প্রিয় বান্ধবীর বক্তব্য ” কালই তো ফোনে কথা হলো “!

প্রেমিক ছেলেটি এই সুযোগে উগড়ে দিয়েছে ” আমাদের একমাস ব্রেকাপ হয়ে গেছে।আমি কিছু জানি না।”

প্রতিবেশিরা কেউ কেউ এগিয়ে আসছে উৎসাহ নিয়ে। কেউ কেউ এখনো প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারেনি।কেউ কেউ ঢুকে গেছে ঘরে।

মেয়েটি হাঁটছে এলোমেলো।

কতটা খুঁজলে ক্লান্ত হয় কেউ।
কতদিন পরে পাশেরবাড়ি ভুলে যায়?
কতটা কান্নার পর মা শান্ত হয় কারোর?

কতটা সময় পরে নিরুদ্দেশ থেকে মৃত ঘোষনা করে সরকার?

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

অনাথ

যেটুকু যা আছে হাঁড়ির মধ্যে ভাত,
খড়কুটো ভেবে তুলে রাখা সওগাত।
পেটেতে ক্ষিদে বুকে’তে জিজীবিষা।
জীবন দেয়নি মৃত্যুদিনের ভিসা।

সব ছেড়ে গেছে ভিটেমাটি কুপোকাত,
মায়ের পরে খালি পড়ে থাকে পাত।
চালচুলোহীন যেন বাড়তি একটা প্রাণ।
ভিড়ে মিশে যাওয়া আলোর মতো ম্লান।

প্রেমিকা জোটেনি বন্ধুও হাতে গোনা।
মনে রাখে শুধু মেটেনি যাদের দেনা।
ছেলে’টা আড়ালে খুঁজছে একটা কোল।
প্রিয়মুখের নামে আগুনে জ্বালানো রোল।

কখনো তুলে ছিলো শখের কোনো ফ্রেমে,
‘সপরিবার’ ঢেউয়ের ভেতর নেমে।
উই ধরে গেছে পচে যাওয়া আসবাবে।
বেচে দিলে স্মৃতি, বিনিময়ে টাকা পাবে।

ঘুমের ভেতর নিভে যাওয়া চিতা ভাসে,
মা পায়ে পায়ে লাল শাড়ি পরে আসে।
কপালে ছুঁয়ে দেয় হাতের পরশপাথর,
স্নেহাশিস ভরা মায়ে’র গায়ের আতর।

  •  
    24
    Shares
  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *