Tue. Sep 24th, 2019

রঙিন অক্ষর সম্পর্ক

শুভঙ্কর দেব

1 min read
Spread the writing

অব্যক্ত

হালকা হলেও মনের ব্যথায় একটা দুটো ওষুধ লাগে,
একটা যদি একলা রাতে ধোঁয়ার মত মুখ ছেড়ে যায়,
অন্যটা কে মাঝ রাতে যেই ফোন করেছি , সব শুনেছে,
বুকের মধ্যে জড়িয়ে রেখে , রাত্রি জেগে কান্না থামায়।

এই পৃথিবীর সব বহুতল তোমার পায়ে নামবে যেদিন,
গোল হয়ে নয় বসবো আবার , তোমায় ঘিরে, অতর্কিতে,
একের পর এক সৈন্য হারার দুঃখে তোমায় জড়িয়ে ধরে,
গাল বেয়ে ঠোঁট নামবে যখন, বাঁধছি তখন জুতোর ফিতে।

তোমার কাছে আগলে রাখা ঠিক যেন ওই মায়ের মত,
চোট লাগেনি বলছি মুখে, তাও যেন সব বুঝতে পারো।
আমার আবার শ্বাসের ব্যামো, জড়িয়ে রাখায় দম আটকে যায়।
থাকছি দূরে , অনেক দূরেই, চাইনি শরীর আবিষ্কার হোক।

এই যে মুখে বলছি তোমায়, আমার আসা, আমার যাওয়া,
আমার কোথায় মন ভেঙেছে, আমার কখন কান্না পেলো,
তোমার ঠোঁটে মলিন হাসি, চোখ ঘুরিয়ে ছাদের কোনায়।
তোমায় দেখে শিখুক মানুষ, কেমন করে সামলেছে লোক।

এই পৃথিবীর সব ঘটনার একটা করে বই ছাপা হোক,
তোমার আমার বৃদ্ধ হওয়ার কাব্য হবে তার একটা তে,
হাজার বছর পরেও যদি কেউ বুঝে যায়, “পাপ ছিল না
আমার শুধু ইচ্ছে ছিল, মরতে পারা তোমার সাথে।”

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

কবি আলাপ

জীবিকার সন্ধানে পাহাড়ের কোল থেকে সমতলের শোরগোলে আসা এক যুবক ইনি। বয়সে এম.এস.ধোনির চেয়ে ১১ বছর ১৪ দিনের ছোট।
তবে বয়স হিসেব করে এই ভদ্রলোকের কবিতার গভীরতা আন্দাজ করতে যাবেন না। আন্তর্জালিক কবিতা জগতে পদার্পণ করার কিছুদিনের মধ্যেই, ভদ্রলোক নিজের শব্দের মায়াজালে আছন্ন করে ফেলেছেন সুইফ্ট সিক্সটিন টু সুইট সিক্সটির হৃদয়।

“তোমার সাথে হয়নি দেখা আর কোনোদিন”

…তোমার মায়ের সাথে কথা আমার ফোনে-ই প্রথম,
গলায় আদুরে ডাক, চিংড়ির টোপ, নিমন্ত্রণে ।
আমার বাবার তোমায় প্রথম থেকেই পছন্দ খুব,
কেমন তুফান তবু সব গোছানো, শ্রীমন্ত মেয়ে।

যেদিন প্রথম কথা, রবীন্দ্রনাথ , ভীষণ প্রিয়,
আর দ্বিতীয় দিনে দুর্বলতা বাউল গানে।
তোমার ছাদে কেবল গোলাপ এবং সূর্যমুখী,
কোনো চাঁদ অথবা অন্য জগৎ, বা উল্কা নেই।

তোমার গিটার থেকে অনেক বেশি সেতার কাছের।
খুব মন খারাপে ছাদের কোণে ফ্লেকের প্যাকেট।
ঠিক পাশের বাড়ির উনিশ কুড়ি, ভীষণ পাকা,
তুমি চুল শুকোও আর ব্যালকনি তে দাঁড়িয়ে দেখে!

এমন অনেক দুপুর আগেও গেছে, আবার যাবে।
তোমার দরাজ গলায় রবীন্দ্রনাথ, টিফিন ব্রেকে।
আমি আগাগোড়াই সবার কাছে লুকিয়ে গেছি,
তুমি একটু বেশিই বান্ধবীদের সবার থেকে।

জীবন আগাগোড়াই অসভ্য আর পৌনপুনিক,
যখন সব গুছিয়ে আঙুল ধরে হাঁটতে যাবো,
ঠিক সেই সময়েই হোঁচট খেয়ে পড়তে হবে!
আর পাশের মানুষ ভিড়ের মাঝে নট রিচেবল ।

আমার নতুন লেখার নতুন বিষয়, দুদিন আলাপ।
তার অসাধারণ গলার আওয়াজ, আবৃত্তিও।
সেই লোভের বশেই নতুন করে রবীন্দ্রনাথ।
ওর মায়ের নাকি আমার লেখা ভীষণ প্রিয়।

তুমি আগেও যেমন সব শুনেছ আমার খবর,
আর তোমার যাপন আমায় লেখার যোগান দিত;
আজ ব্যস্ত ছিলাম নতুন লেখায় , ফোন করিনি,
তুমি নষ্ট কবির একুশতম উপেক্ষিত।

জীবন এক কাঠামোর ধাঁচেই সবার সৃষ্টি করে,
শুধু ওপর ওপর রঙিন প্রলেপ, দুচোখ টানে।
খোলস বদলে নেওয়া ঠিক যত টা অস্বস্তিকর,
আর মানুষ বদল তারচেয়ে বেশি অসম্মানের।

আগে তোমার ছোঁয়া বরফ গলা সেতার এ রাগ,
এখন পাহাড় বুকে হারিয়ে যাওয়া খোয়াই নদী;
আমার তোমার সাথে হয়নি দেখা অনেক বছর,
আমার তোমার সাথে হয়নি দেখা আর কোনোদিন।

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

ভূমিকা

আত্মার কাছে সচেতন বাণী , শরীরের কাছে ধর্মের ,
মানুষের কাছে ততটা তফাৎ যেটুকু মুখোশ ও বর্মে ।

কালকুঠুরি তে ফেঁসে থাকা লোক আজীবন শুধু আলোকে
তুলনা করেছে স্বর্গের সাথে, প্রিয় স্পর্শকে পালকের।

হেঁটে হেঁটে যারা বাড়ি ভুলে গেছে, তাদেরও মায়ের জন্যে
মনখারাপের বহুকথা আছে, অথচ বাড়িতে ফোন নেই।

এতো টুকু জ্বালা সবার থাকবে, চাকরি হারাবে, মানুষও।
চাহিদা থাকবে, পূরণ হবে না, আমাদের নতজানু শোক।

আমি ফিরে এলে এক কাপ কফি, না ফিরে এলেই ঝাপটা,
তোমার কাহিনী, জায়গা পেয়েছি, মাঝখানে দুটো চ্যাপ্টার।

তাসের ওপরে তাস সাজিয়েছি, যেভাবে গত দু হফতা
গরম বাড়ছে , তবু অন্তত আজ রাত ফ্যান অফ্ থাক।

তুমি চলে যাবে , আমি চলে যাব, লোকে ডেকে নেবে সভা,
দু’খানা লাইনে কষ্ট লিখেছি, ভালো লেগে গেছে, কভার।

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

ইকুয়েশন

প্রিয়তমা, দুটো সাগর নিজের অবস্থানের সময়
কিছু নিয়ম ভাঙে পরস্পরের, নিজেরা যোগ করে,
ওরা কোথাও এসে মেশে, আবার কোথাও আলাদা হয়,
“আমি চেয়েছি সামলাতে, কিন্তু পারিনি তারপরে”

আমি সামান্য এক আয়ের মানুষ , ছিলনা জোর কোথাও।
তোমার চোখের কাছে অন্য মানুষ এঁকেছে ঘর বাড়ি।
ভাত মুখের কাছে এগিয়ে দিতে, মেঝেতে পড়তো তাও,
এক অদম্য জেদ আমার, তবু তোমাকে দরকারই।

**

সেসব বহু আগের কথা, তখন কলেজে , আর টপার,
বাবা অনেকটা আয় করেন, এবং আমিও তার প্রমাণ,
তুমি ভীষন দূরে থাকো, মলিন, মাথার ওপর খোঁপা,
যেদিন প্রথম দেখি তোমায়, তখন বয়সও প্রায় সমান।

তুমি তোমার ক্লাসে মেধাতে আর গানে সরস্বতী,
আমি খবর পেলাম , শুধু তুমিই আমাকে দেখছো না,
এমন অনেক মানুষ ভেঙেছি, তার সবই এখন অতীত,
শুধু তোমার কিসের অহং? আমার উচিৎ নিজে শোনা।

দুদিন ইগোর লড়াই হল, শেষে কলেজে ধুন্ধুমার,
তোমার পছন্দ জানতে পাই, যেদিন রুপম এলেন, সোশ্যাল।
ক্রমে কমলো মেঘের ওজন, তুমি বন্ধু হলে আমার,
রাতে ফেরার সময় ইচ্ছে করেই তোমার পাশে বসা।

মাঝে অসংখ্য বার, যেমন করে দায়িত্ব নেয় হোঁচট
দিনে চোখের নীচে কালি, আমার সামলানো সখ তোমায়,
তবু বলোনি মুখ ফুটে , যতই আড়ালে চোখ মোছো,
একটা দুর্ঘটনায় তোমার মানুষ আঠারো দিন কোমায় ।

**

সব সাজানো হচ্ছিল, তারিখ পরের মাসেই বিয়ের,
হঠাৎ অফিস ট্রিপে বাবার সাথে কাশ্মীরে যাচ্ছিলাম,
আমার হুজুগ হল দিল্লি থেকে নিজের গাড়ি নিয়ে,
একটা বরফ সাদা ডিসেম্বরে পার হয়ে যাই ঝিলাম।

সব গতে বাঁধাই ছিল, একটা অসাধারন ট্রিপের,
আমরা বাড়িতে ফিরছিলাম, কিছু সফেদ স্মৃতি জমাট,
ছোট হলুদ ফ্রকের মেয়ে, তার আলগা চুলের ক্লিপে
এমন দৌড়ে এলো পথে, জীবন তখনই তর্জমা।

**

তোমার দায়িত্ববোধ বেশি যেমন, ভালোবাসা আরও,
আমায় অবাক করে পিছিয়ে দিলে হঠাৎ বিয়ের তারিখ,
বাবা ফেরেনি আর ঘরে, তেমন হালত অফিসটারও,
এমন ওষুধও নেই কোথাও, আমি দাঁড়াতে ফের পারি।

তুমি সামলে নেবে বলেই , আমার বন্ধুরা সব রাজী,
তুমি সামলে নেবে বলেই, এতে সম্মতি নেই মায়ের,
তোমার বাবার অফিস কলিগ, তার ছেলেও হল হাজির।
তুমি বুঝলে পরিস্থিতি , আর হঠাৎ হলে গায়েব।

সেদিন চলে যাওয়ার আগেও আমার মাথার কাছে বসে,
খানিক সাহস দেওয়ার ছিল, তুমি ভীষন ভালো পারো।
কোলে ঘুমিয়ে পড়া মানুষ, তাকে একলা করা দোষের,
তুমি ভালোই জানো সেসব, তবু ডাকোনি একবারও।

সেদিন সাদা রঙের খামে আমার হাসপাতালের ঘরে,
একটা লড়াই করা শরীর, একটা হার না মানা বুকে,
শুধু যেটুক আমার কানে এলো, “পারিনি তারপরে..
তোমায় আগলে রাখা ভালো, কিন্তু জড়িয়ে থাকা দুখের।”

  •  
    61
    Shares
  • 57
  • 4
  • 0
  •  
  •  
  •  

1 thought on “শুভঙ্কর দেব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *